অগ্নিষোমীয় ব্যুহ হল সৃষ্টির কাঠামো, এক অনন্ত বিন্যাস। ভক্ষক-ভক্ষিতের সম্পর্ককে বেঁধে রাখার এক চিরন্তন প্রতিষ্ঠান। এই বিষয়টি উপনিষদ এবং যোগবাসিষ্ঠে আলোচিত হয়েছে। গীতায় কৃষ্ণ এই বিষয়টি সম্পর্কে বলেন যখন তিনি চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি, শক্তি, প্রাণরস, চিন্তা ইত্যাদির সাথে নিজেকে অভিন্ন রূপে বর্ণনা করেন (ভ. গী. ১৫.১২-১৫)। ‘অগ্নি’ যেখানে ভক্ষকের প্রতীক, ‘সোম’ সেখানে ভক্ষিতের। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অগ্নির জন্য উপযুক্ত পরিমাণে সোমের প্রয়োজন। কৃষ্ণ নিজের...
 
0
কৃষ্ণ যখন অনাসক্তি এবং তৃপ্তি নামক বৈশিষ্ট্যগুলির প্রশস্তি করেন, তখন তিনি কঠোর পরিশ্রমের উপরেও গুরুত্ব আরোপ করেন। স্ববিরোধী যৌক্তিকতার ঝুঁকি নিয়েও কৃষ্ণ গীতায় বলেন, আমি সমস্ত কিছুই লাভ করেছি, তথাপি আমি কর্মে রত (ভ. গী. ৩.২২)। আমি যদি অক্লান্ত কর্মে অসমর্থ হই, তাহলে এই উদাহরণ অনুসরণ করে মনুষ্যজাতি অচলাবস্থায় স্থিত হবে (ভ. গী. ৩.২৩)। যদি আমি কর্ম না করি, তাহলে এই পৃথিবী ধ্বংস হবে, এবং এই অনাসৃষ্টির জন্য দায়ী থাকব আমি (ভ. গী. ৩.২৪)। তাঁর একথা বলার...
 
0
ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণের প্রাসাদে কুচেলার আগমন নিয়ে একটি মর্মস্পর্শী অধ্যায় আছে। সান্দীপনীর গুরুকুলে কৃষ্ণ এবং কুচেলা সহপাঠী ছিলেন। যখন কৃষ্ণ রাজার ন্যায় জীবনযাপন করছেন, তখন কুচেলা অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে। কুচেলা কতকটা সাহায্যপ্রার্থী হয়েই পুরাতন বন্ধু কৃষ্ণের কাছে এসেছিলেন, কিন্তু যখন তিনি কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হলেন, তখন আর সেকথা বলতে পারলেননা। কৃষ্ণ কোনও প্রতিদানের আশা ব্যতীতই কুচেলাকে অনেক কিছু দান করেন। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, তাঁর মত একজন...
 
0
গীতায় কৃষ্ণকে প্রায়শই ভক্তি সম্বন্ধে কথা বলতে লক্ষ্য করা যায়। তিনি যতদূর বলেন - যে রূপে চাও সেই রূপে আন্তরিকভাবে ঈশ্বরের উপাসনা কর ; তোমার বিশ্বাসকে আমি শক্তিপ্রদান করব (ভ.গী. ৭.২১)। কিন্তু একথা কি কৃষ্ণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ? তিনি কি একজন ভক্ত? নাকি একজন দাম্ভিক দেবতা? মাতাপিতা, গুরুজন, শিক্ষক এবং জ্ঞানীর প্রতি কৃষ্ণের ভক্তি ও আনুগত্য লক্ষণীয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তিনি যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞকালে উপস্থিত সকল ঋষির চরণধৌত করেছিলেন (ম. ভা. ২.৩০-৩২...
 
0
গীতার মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্জুনকে যুদ্ধে সম্মত করিয়ে শত্রুনিধন। কৃষ্ণ তাঁর বাক্যে কোনরকম জড়তা না রেখে অর্জুনকে অগ্রসর হয়ে প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হওয়ার কথা বলেন। অর্জুনের মনে এই প্রত্যয় আনয়নের পথে তিনি নানাবিধ যুক্তিজাল বিস্তার করেছেন (ভ. গী. ২.৩১-৩৩, ১১.৩৪)। কিন্তু এগুলি কোনও শূন্যগর্ভ উপদেশাবলী নয়। কৃষ্ণ নিজেও প্রচুর প্রাণনাশ করেছেন। তিনি নিজেও নিজেরই আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করেছেন। তিনি নিজের মাতুল কংসকে বধ করেছেন কারণ কংস একজন ধর্মভ্রষ্ট অত্যাচারী...
 
0
গীতায় কৃষ্ণ শান্তিলাভ করার নিমিত্ত এক অশ্রুতপূর্ব সূত্র প্রদান করেন। তিনি বলেন যে, যখন কোনও ব্যক্তি কামনার ঊর্দ্ধে গিয়ে, আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ ক’রে, অহং এবং অধিকারবোধ বর্জন ক’রে জীবন অতিবাহিত করেন, তখনই সেই ব্যক্তি প্রকৃত শান্তিলাভ করেন (ভ. গী. ২.৭১)। কৃষ্ণ নিজজীবনে শান্তিলাভের জন্য অবিকল এই পন্থাই অনুসরণ করেছেন। কৃষ্ণ ব্যক্তিগত লাভ, কামনা ও আকাঙ্ক্ষা বর্জিত এক জীবন কাটিয়েছেন। কখনও কোনও বস্তুবিশেষ, ক্ষমতা, পদ বা খ্যাতির অন্বেষণ করেননি। কখনও লাভের...
 
0
কৃষ্ণের জীবনের প্রারম্ভে তেমন প্রাচুর্য না থাকার কারণেই সম্ভবত তিনি অনাড়ম্বর জীবনেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। যদিও পরবর্তীকালের পণ্ডিতদের কল্পনায় কৃষ্ণের পরিহিত বহুমূল্য বস্ত্রাদির উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু প্রাচীন গ্রন্থগুলি থেকে তেমন কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়না। তাঁর বস্ত্রের বর্ণ ছিল হলুদ (পীতাম্বর), খুব সম্ভবত তাঁর কৃষ্ণ গাত্রবর্ণের সঙ্গে মানানসই হত বলে। তাঁর ভূষণ ছিল যৎসামান্য। তিনি বনপুষ্পমাল্যে ও মৌরমুকুটে সুশোভিত হতেই পছন্দ করতেন। গীতায় কৃষ্ণ...
 
0
গোপালকদের মাঝে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণ ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন ভূমিপুত্র। শিশুকাল থেকেই যেন প্রকৃতির সাথে তাঁর আত্মিক যোগ। শৈশবেই তিনি প্রাকৃতিক পরিবেশকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছিলেন। ভাগবত পুরাণের একটি অধ্যায়ে তাঁকে একটি সুপ্রাচীন বটবৃক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে দেখা যায় (ভা.পু. ১০.২২)। বৃক্ষ, গাভী ও মানুষের প্রতি কৃষ্ণকে সশ্রদ্ধ হতে দেখা যায়। সশ্রদ্ধ হতে দেখা যায় সমগ্র সৃষ্টির প্রতি। এমনকি, যুদ্ধে পরাজিত করার পরেও তিনি কালিয়ানাগকে বধ করেননি, বরং...
 
0
এমন কিছু মানুষ থাকেন যাঁদের বয়সের সাথে পূর্ণতা লাভ করার প্রয়োজন পড়েনা, জন্মের সাথে সাথেই যাঁরা সম্পূর্ণ, আত্মজ্ঞানে পরিপূর্ণ। আন্তর বিবর্তন ও মানসিক বৃদ্ধি তাঁদের নিষ্প্রয়োজন, কারণ তাঁরা ইতিমধ্যেই বিবর্তিত। কৃষ্ণ হলেন তাঁদেরই একজন। শৈশবাবস্থার কৃষ্ণলীলা আমাদের সবিস্তারে পরিচিত হলেও, তাঁর তৎকালীন চিন্তাধারা আমাদের অবগত নয়। আমরা যেটুকু বুঝতে পারি সেটা হচ্ছে, তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি শৈশবাবস্থা থেকেই সকল উত্থান-পতন কে জীবনের অঙ্গ হিসেবে মেনে...
 
0
আমাদের অনেকের কাছেই কৃষ্ণ হলেন হিন্দুধর্মাদর্শের প্রতীক। তাঁর প্রতিটি চিন্তাধারায়, বাণীতে ও কর্মে হিন্দুমতাদর্শ প্রতিফলিত হয়। তাই এতে এমন কিছু আশ্চর্য লাগেনা, যখন দেখা যায় যে, ভারতযুদ্ধকালীন অর্জুনকে প্রদত্ত তাঁর পরামর্শ গুলি হিন্দু-ভাবনার সর্বশ্রেষ্ঠ সারকথা রূপে পূজিত হয়। ভগবদ্গীতার বর্তমান রূপ-টির প্রতিটি শব্দই যে কৃষ্ণ কর্তৃক উচ্চারিত হয়েছিল, তা আজ জোর দিয়ে বলা না গেলেও, খুব সম্ভবত এটাই মনে হয় যে, অন্তত গীতার মূল সার-টি কৃষ্ণেরই বাণী। আমরা...
 
0